কুশিয়ারা নদীর পানি যতটা ধীর গতিতে নামছে ঠিক ততটাই ভোগান্তি চরম আকার ধারন করছে সিলেটের উপজেলার ১০ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভায়। গতকাল সোমবার কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদ সীমার ৫২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এক দিনের ব্যবধানে নদীতে পানি কমেছে মাত্র সেন্টিমিটার।
পানি নামার গতি ধীর হওয়ায় পুরো উপজেলায় পানিবন্দী দশা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্রে যারা আছেন তারাও মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এক কক্ষে ৮/১০ টি পরিবার কোন রকম সময় পার করছেন। ঘুম নেই, খাবারও অপ্রতুল। একই সাথে অনেকে গবাদিপশু নিয়েও পড়েছেন বেকায়দায়। বাড়ি ফেরার আকুতি থাকলেও ঘর থেকে পানি না নামায় বাধ্য হয়েই থাকতে হচ্ছে আশ্রয় কেন্দ্রে।
উপজেলার প্রায় সবগুলো আশ্রয়কেন্দ্রে দুই বেলা রান্না করা খাবার ব্যক্তি বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বিতরণ করা হচ্ছে। উপজেলার দিনমুজর ও দরিদ্র মানুষের দিন চলছে সরকারী বেসরকারী ত্রাণ সহায়তা প্রাপ্তি মাধ্যমে। তবে এই বন্যায় সবচেয়ে খাদ্য ঝুকিতে আছে শিশুরা। যাদের তরল খাবারই ঠিক মত খাওয়ানো যায়না তারাও খেতে বাধ্য হচ্ছে বড়দের শক্ত খাবার। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে ১ বছর পর্যন্ত যেসব শিশুরা আছে তারা রয়েছে আরো কষ্টে। যেসব শিশু মায়ের বুকের দুধই একমাত্র খাবার, মায়ের খাবার ঠিকমত না হওয়ায় মায়ের বুকেও দুধ নেই। এসব শিশু নিয়ে সবচেয়ে বিপাকে প্রসুতি মায়েরা।
কুশিয়ার তীরবতী বিয়ানীবাজার উপজেলার দুবাগ, শেওলা, কুড়ারবাজার ও আশপাশের কয়েখটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, গত ৭ দিন আগে যেসব এলাকায় কুশিয়ার বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ভেঙ্গে ও উপচে পানি ঢুকেছে সেসব এলাকায় এখনো সেই আগের মতই রয়েছে। নিচু এলাকার অনেকেই প্রথম দিনেই আশ্রয় নিয়েছেন সরকারী অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে। কেউ আবার বাড়ী ঘরের মায়া ছাড়তে পারেনি। ঘরে হাটু পানি কিন্তু কোন রকম কষ্ট করেই নিজ ঘরেই দেখা যায় তাদের।
এদের মধ্যে একজন বিয়ানীবাজার উপজেলার মাথিউরা ইউনিয়নের খলাগ্রামের মাহমুদ হোসেন। মাথিউরা পশ্চিম হাওরে কয়েক বছর পূর্বে স্থানীয়দেরসহাযতায় বাড়ি করেছেন। ঘরের ভেতর হাট পানি থাকলেও সত্রী সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি বলেন এর আগে ২০০৮ সালে তার বাড়িতে পানি উঠেছিলো তারপর আর এমন বন্যা দেখেননি তিনি। এর আগে পানি দ্রুত নেমে গেলেও এবার পানি নামার গতি খুব ধীর। গরু এবং ঘর চুরি হয়েযেতে পারেন এই ভয়ে তিনি নিজে এখনো রয়ে গেছেন। তার দুঃশ্চিন্তা এই বন্দি দশা থেকে কবে মুক্তি মিলবে। একই অবস্থা পাশের বাড়ির সাহেদ ও দিলন আহমদের, ঘরে হাটু পানি, চারদিকের রাস্তায় কোমর সমান। নৌকা দিয়ে কুচুরিপনা ঠেলে জরুরী প্রয়োজনে বের হন। ইচ্ছা থাকলেও সব সময় বাড়ি থেকে বের হকে পারেন না। অনেকটা জেলা খানায় বন্দি আছেন বলে জানান সাহেদ আহমদের স্ত্রী ফরিনা বেগম।
অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্রে যারা আছেন তারাও মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রশাসনের হিসাব মতে ২৭ জুন পর্যন্ত বিয়ানীবাজারে ৭৪ টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৬৭৮৯ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। একই সাথে এসব আশ্রয় কেন্দ্রে ৯২২টি গবাদি পশু রাখা হয়েছে।
সরেজমিনে বিয়ানীবাজার উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা যায়, কয়েকটি কক্ষে ভাগাভাগি করে থাকছেন অনেক পরিবার। গত ৭ দিনে পানি না কমায় এখনো কেউ বাড়ি ফিরতে পারেনি তারা। স্থানীয়দের দেয়া রান্না করা খিচুড়ি, বিরিয়ানি কিংবা ভাত ডাল ২ বেলা সরবরাহ করছেন। সেই খাবারেও অনেকের অনিহা থাকলে জীবন বাচাতে কোন রকম খাচ্ছেন। তবে সবার চোখে মুখে বাড়ি ফেরার আকুতি। অনেকেই বলছেন পানি ঘর থেকে নামলেই তারা বাড়ি ফিরতে চান। নিজের ঘরে অনাহারে থাকলেও ভাল। এই কষ্টের জীবন আর ভাল লাগছে না।
পরিবার নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে থাকায় সফিক উদ্দিন বলেন, রাতে ঘুমানোর কোন সুযোগ নেই। যে যায়গা আছে, শিশু ও মহিলারা থাকেন। পুরুষরা সবাই বসেই কাটাচ্ছেন গত ৬ দিন ধরে। রয়েছে শিশু খাবারেরও সংকট। মোহাইমিনা বেগম কয়েখ মাসের ছোট্ট সন্তান নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছেন। ইউপি চেয়ারম্যানসহ অনেকেই সহযোগিতা করছেন কিন্তু সদ্যজাত সন্তান নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে খুব কষ্ট হচ্ছে বলে জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক নূর বলেন, আশ্রয় কেন্দ্রসহ বন্যা কবলিত এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকারি ত্রাণ সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। একই সাথে সামাজিক সংগঠন গুলোও ত্রাণ বিতরণ করেছে।