১৯৯১ সালের জুলাই আগস্ট মাসের তপ্ত এক সকালের কথা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীর এক কোনে আমি বসে আছি। জমজমাট ক্যাম্পাসে আমি একদম নবাগত তাই চারিদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কিছু দেখছি অবাক বিস্ময়ে। অনেক আশা আকাঙ্খা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়েছি। কোন সাব্জেক্টে চান্স পাবো তা বড় কথা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে দেশের সর্ব্বোচ্চ ডিগ্রী নিযে জীবন জীবিকার ভবিষ্যৎ পোক্ত করতে হবে এই আশায় আমি মরিয়া। বিজ্ঞান অনুষদ বাদ দিতে সবগুলো অনুষদেই পরীক্ষা দিয়েছি, ভয় আমার একটা অনুষদেও যদি চান্স্ না পাই তবে বাড়িতে মুখ দেখানো যাবে না। যাই হউক আল্লাহর রহমতে তিন অনুষদে সুযোগ পেয়েছি। কলা,সামাজিক বিজ্ঞান ও আইন এই তিন অনুষদের ভর্তি ফর্ম তুলে নিয়েই লাইব্রেরির কোণায় বসে মুখর ক্যাম্পাস দেখতে আমি মগ্ন। খুঁজছি আমার কলেজের কোনো বন্ধুদের পাওয়া যায় কি না, যাতে আলাপ করে কোন সাবজেক্টে ভর্তি হওয়া যায় সেই সিদ্ধান্ত।
“এই তুই বিপ্লব না” ?
আমি হঠাৎ এই ডাক শুনে চমকে উঠলাম। ফেঞ্চুগঞ্জের সবাই আমাকে বিপ্লব নামেই ডাকে আর ‘বিপু’ নাম বাসা এবং খুব কাছের কয়েকজন ছাড়া ফেঞ্চুগঞ্জের কেউ ডাকতো না। এমনকি এই ফেঞ্চুগঞ্জ ছেড়ে আসার পর এই নামটি আমার হারিয়ে গেছে অদ্যাবধি পর্যন্ত। স স্বভাবতই আমি চমকে ফিরে দেখি আমার সেই ফেঞ্চুগঞ্জের সবার প্রিয় “আব্দুর রকিব মন্টু” ভাই। একসাথে স্কুলে অনেক খেলাধুলা করলেও এক ক্লাস উপরে পড়ার কারনে আমি তাকে ভাই বলেই ডাকি। ১৯৮৭ ব্যাচের অধিকাংশ ছেলেদের সাথে আমার তুই ও তুমি সম্পর্ক। হাতে গোনা কয়েকজনকে আপনি বলে ডাকতাম তার মাঝে মন্টু অন্যতম। আগে থেকেই মন্টু ভাই ও তাদের পরিবারের সবাই আমাকে অনেক স্নেহ করতেন।
আমি মন্টু ভাই কে দেখে এতো খুশি হলাম যে দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। রাজশাহীর মত অচেনা জায়গায় যেখানে আমার বগুড়া জেলার কাউকেই পাচ্ছিলাম না সেখানে এন জিএফএফ স্কুলের পুরোনো ভাই বন্ধুকে পেয়ে আমার মনের অবস্থা আনন্দে তুঙ্গে।
আমি তখন বগুড়া জেলা ফুটবল দলের নিয়মিত খেলোয়াড়। সারা উত্তর বঙ্গের সব নামিদামি খেলোয়াড়দের সাথে বিভিন্ন মাঠে আমি খেলে বেড়াই এই খবরটি উনি এনজিএফএফ এর ফুটবলার বন্ধু কামরুলের কাছ থেকেই জানতেন। কোলাকুলি করে বললেন চান্স্ পাইছিস? আমি বললাম তিন ইউনিটে চান্স্ পেয়েছি। বললেন কোনটায়? আমি শুধু আইন সাবজেক্টের কথা বলা মাত্র বাকিটা আর শুনলেন না। আমার হাত ধরে জোর করে নিয়ে গেলেন আইন অনুষদের ডিন ক্যাম্পাসের প্রতাপশালী শিক্ষক ডঃ বদর উদ্দিনের চেম্বারে।
সরাসরি আমাকে নিয়ে ঢুকে গেলেন, আমি এসব কিছুই চিনি না কাউকেই চিনি না। একজন বয়স্ক শিক্ষকের চার পাশে ঘিরে অনেক জন। তাদের সবাই কে কাটিয়ে গিয়ে বল্লেন স্যার এই ছেলে আইনে মেধায় চান্স পেয়েছে বগুড়া জেলা ফুটবল দলের প্লেয়ার ক্রিকেট ও ভালো খেলে একে যদি এখনি ভর্তি না করানো হয় তবে একে ইকোনোমিক্স বিভাগ নিয়ে নেবে। আমি আসলে কিছুই বুঝতে না পেরে হা করে তাকিয়ে দেখছিলাম। স্যার লাফিয়ে উঠে বললেন মন্টু তুমি এখনি একে নজরুলের কাছে নিয়ে যাও সেই সব ভর্তির ব্যাবস্থা করবে আমি বলে দিচ্ছি আর যেন কোন ভাবেই এই ছেলে অন্য কোথাও না যেতে পারে।
বলা বাহুল্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির মত ঝামেলার কাজ আমার দুই ঘন্টায় শেষ। আমার ব্যক্তিগত কোন পছন্দের সাব্জেক্ট আছে কিনা মন্টু ভাই তার তোয়াক্কাই করলেন না। ভর্তি হয়ে গেলাম।
সব শেষ হবার পর বল্লেন। তোর কি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ের উপর কোন ধারনা আছে? আমি বললাম না ভাই নেই.. ওকালতি আমার পছন্দ না। আমি উকিল হতে চাই না ভেবেছিলাম যদি চান্স পাই তবে মাইগ্রেশন করে অন্য বিষয় চলে যাবো। উনি আমাকে বল্লেন বাংলাদেশে যতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় আছে তার প্রতিটি সাব্জেক্ট তিন বছরের অনার্স কিন্ত একমাত্র আইন চার বছরের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ভারতীয় উপমহাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের চালু প্রথম অনার্স সাবজেক্ট এর আগে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাবজেক্ট ছিলো না, ‘ল’ পড়ানো হতো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনের কলেজ গুলোতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শুধু লেখাপড়াতে বাংলাদেশের দেশ সেরা ‘ল’ স্কুলই নয় বরং খেলাধুলাতে আন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা।তুই এখান থেকে পাশ করে উকিল হবি না কি হবি সেটা ভবিষ্যতের ব্যাপার কিন্তু আমি তোকে সেরা একটা বিষয়ে ভর্তি করে দিলাম। দিলো আমার মগজে ঢুকিয়ে। এই হলো আমার উচ্চশিক্ষা জিবনের শুরু।
ক্যাম্পাস লাইফে মন্টু ভাইয়ের সাথে সবসময় থাকতাম ছায়ার মতো । দেশের নামি দামী খেলোয়ারদের সাথে পরিচিত হয়েছি আড্ডা দিয়েছি। আমার দুজন সারা দেশ ব্যাপি বিভিন্ন মাঠে খেলেছি। চারবার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তবিভাগ ফুটবল প্রতিযোগীতায় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। আবাহনি মোহামেডান ব্রাদার্সের অনেক খেলোয়াড় বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া করলেও স্টেডিয়াম ছিল মন্টুর দখলে। ডিপার্টমেন্টর সংসদ, স্টেডিয়াম পাড়া, খেলোয়ার সমিতি বিভিন্ন ইভেন্ট গুলোতে মন্টু ভাই ছিলো সবার আগে। আমি সহ জুনিয়র কিছু তার সাথে ছিলাম ছায়ার মত যা আজ অবধি আছে। আমি তাকে এখনো ‘ক্যাপ্টেন’ বলেই ডাকি।
৯৪/৯৫ সালে জামাত শিবির যখন ক্যাম্পাস দখল করে রক্তের হোলি খেলায় উল্লাসিত, যখন ক্যাম্পাসের সকল নেতা প্রান ভয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকতো না সেই সময় মন্টু ভাইকে আমি দেখেছি ছাত্রলীগের মিছিলে বজ্রকন্ঠ নিয়ে প্রতিবাদ করতে। এস এম হলে তাকে জীবন নাশের হুমকি দিয়েছিল শিবিরের গুন্ডারা। খেলাধুলা নিয়েই যেন মন্টু থাকে সে জন্য দিনরাত তাকে মানসিক চাপে রাখতো। কিন্ত ব্যক্তি মন্টু এত প্রভাবশালী এবং এত সাহসি ছিল যে তারা কিছুই করতে পারেনি। আব্দুর রকিব একজন চ্যাম্পিওন খেতাব নিয়ে বীরের বেশে দলমত ভেদে সবার ভালোবাসা নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার চত্ত্বর ত্যাগ করেছে।
এবার বলি ক্যাপ্টেনের অন্য ব্যাপার গুলি কি করেছে লেখাপড়ার পাশাপাশি আর লেখাপড়ার পরঃ
১. বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়ার কল্যান সমিতি গঠন।
২. বিশ্ববিদ্যালয়ের এথলেটিক্স উন্নয়ন সমিতি গঠন
৩. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল খেলোয়াড় সমিতি গঠন
৪. আইন বিভাগ ক্রিড়া কমিটি গঠন
৫. রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ল এলুমনাই গঠন এবং নির্বাচিত সাধারন সম্পাদক। সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০০০ ( এই সমিতিতে সারা বাংলাদেশের আইন বিভাগের সকল ক্ষেত্রের শীর্ষ পদের ব্যাক্তিরা সদস্য এবং বলা যায় এই সমিতি বাংলাদেশের বিচার ব্যাবস্থার মুল চালিকা শক্তি)
দেশের এথলেটিক্স ও ফেডারেশন নিয়ে আর লিখলাম না কারন এটা সবাই জানে
এবার আসি আজ আমি কেন এই বায়োগ্রাফিলিখছি-
দেশের সেরা ল’ স্কুল থেকে গ্রাজুয়েট মন্টু দেশের সর্বোচচ আদালতের এটর্নী অফিসের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আইনজিবী। এটা তার পেশাগত পরিচয়। সংগঠন চিন্তা মন্টুর কাজে কর্মে ও চলনে। দেশের যুব সমাজের জন্য মন্টু যে কত সাংগঠনিক সেটা আমরা খুব কাছে থেকে দেখেছি তারাই জানি।
মন্টু আজকে সিলেট- ৩ শুন্য আসন থেকে সাংসদ পদপ্রার্থী। সে মনোনয়ন পাবে কি পাবে না সেটা তার দলের সিদ্ধান্ত। তবে আর বাকি অন্যান্য দের সাথে যখন আমি ব্যাক্তিগত ভাবে তুলনা করি, তখন দেখতে পাই মন্টুর কাছে অন্য দুজন কিছুই নয় তার মধ্যে একজন নামকরা চিকিৎসক ও ভালো পদে আসীন হলেও।
দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন তারুন্য নির্ভর, সাংগঠনিক ও আধুনিক চিন্তার শিক্ষিত নেতা খুঁজছেন আগামীর জন্য, তখন সিলেট – ৩ আসনে আব্দুর রকিব মন্টু হতে পারে সেরা এক পছন্দ। আমি জানি বাছাই কমিটিতে সব বাঘ গুলো বসে আছেন এবং অনেক তদবির লবিং চলছে তার পরেও আমি ও আমার মত সাধারন কিছু ৭১ এর প্রজন্মের কাছে মন্টু একজন “ক্যাপ্টেন’ ছিলেন ও থাকবেন।
আমরা কেউ ওই আসনের ভোটার নই তাই ক্যাপ্টেনের জন্য শুভ কামনা রইলো। “ক্যাপ্টেন” আপনি নির্বাচিত হলে ফেঞ্চুগঞ্জ আধুনিতার পরশ পাবে, দেশের মৃতপ্রায় ক্রীড়াংগন প্রান পাবে, সংসদ একজন দক্ষ আইনজ্ঞ পাবে, দেশের বিচারবিভাগ অনেক এগিয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা আমার প্রানের এন জি এফ এফ অবিলুপ্ত সভ্যতা হিসেবে বেচে থাকবে।
ক্যাপ্টেন তোমাকে স্যালুট জানাই। শুভকামনা নিরন্তর। ভালো থেকো।
মেহেদী মাসুদ (বিপ্লব)
স্কুলঃ ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানা স্কুল(১৯৮৮ ব্যাচ)
এলএল.বি (অনার্স) এলএল.এম (রাঃবি)
এম.বি.এ( কার্ডিফ, যুক্তরাজ্য)
স্কটল্যান্ড থেকে।
জালালাবাদ ভিউ / জুয়েল /৩৪৭৮