মাস্টার মোঃ আরজদ আলী একজন জ্ঞানীগুণী মানুষ ছিলেন।দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরির লক্ষে আজীবন নিরলস কাজ করে গেছেন।শিক্ষানুরাগী মহান এ ব্যক্তি শিক্ষার পাশাপাশি মানবসেবায়ও ব্রত ছিলেন।সংগ্রামী মানুষটি ছিলেন সত্যের ধারকবাহক।
মহান গুণী এই ব্যক্তির লিখিত বই” preserved for Eernity চিরকালের জন্য সংরক্ষিত
মঈনপুর বহুমূখী উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়
ছেড়ে চলে যাচ্ছি” পুস্তিকা থেকে কিঞ্চিত পর্যালোচনা করব।
লেখকের লেখানীর ওপর হাত তোলার দুঃসাহস হয়নি;কোনো ধরনের কাটছাড় ছাড়া তাঁর লিখিত শব্দ-বাক্য হুবহু তুলে ধরা হবে।
বইটিতে রয়েছে মঈনপুর,ছৈলা,লাকেশ্বর, খুরমা, সিঙ্গেরকাছ, রেঙ্গা শরীষপুর,কোনাউরা নোয়াগাঁও ইত্যাদি গ্রামের বিবরণী ;আছে বৃটিশ শাসন,খেলাফত আন্দোলন,ছাত্ররাজনীতি, স্কুলকমোটি, শিক্ষার মান ও গুণী মানুষের ত্যাগ তিতিক্ষার কথা।
পর্ব-১
সিলেট জেলা-ভাগ:
বৃটিশরা অনায়াসে খাজনা আদায়ের জন্য সিলেট কয়েকটি ভাগে ভাগ করে দেয়।এ ব্যাপারে মোঃ আরজদ আলী বলেন,”খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য,তারা সিলেট জেলাকে তখন দশটি জেলায় ভাগ করে নেয়।সদরে তাজপুর,পারকুল,জৈন্তায়াপুর তিনটি জেলা ছিল।দশটি জেলার মধ্যে কোনটিতে শুধু কালেক্টারেট ছিল।
সুনামগঞ্জ পত্তন:
সুনামগঞ্জ মহকুমা চিহ্নিত হওয়ার পূর্বে,এই মহকুমায় ছিল একমাত্র জেলা রসুলগঞ্জ।রসুলগঞ্জ কিন্তু কালেক্টারী ও মোন্সেফী আদালত দুই-ই ছিল।১৮৭৭ খৃষ্টাব্দে সুনামদি সিপাহীর অগ্রণী ভূমিকায়,সুনামদির নামে সুনামগঞ্জ (জেলার)প্রত্তন।
মঈনপুর মাদ্রাসা স্হাপন:
সুনামগঞ্জ শহর প্রতিষ্ঠার পনেরো বছরের মধ্যে অর্থ্যাৎ ১৮৯২ খৃষ্টাব্দে মৌলভী নূর মোহাম্মদ,এই গ্রামের মধ্যে একটি মাদ্রসা প্রতিষ্ঠিত করেন।দুই বছর পর,তিনি বুরাইয়া মাদ্রাসায় যোগদান করেন,কান্দিগাঁও নিবাসী মৌলভী কোরবান আলী সাহেব,মাদ্রাসা পরিচালানার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মাদ্রাসা বন্ধ:
১৮৯৭ সালে খৃষ্টাব্দে আসাম প্রদেশ ব্যাপি প্রবব ভূমিকম্পে প্রদেশের সমস্ত পাকাঘর ধ্বসে পড়ে।মঈনপুর মাদ্রাসাটি ও স্বাভাবিক ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
প্রাথমিক বিদ্যালয় স্হাপন:
(১৮৯৭ সালে)এই বছরেই ছৈলার ওসমান আলী ও নজাবত আলী মাষ্টার সাহেব-দ্বয়,এই গ্রামের মধ্যস্হলে একটি প্রথমিক বিদ্যালয় স্হাপন করেন।
কিছুদিন পর তাদের মধ্যবর্ত্তী হয়ে আসেন,লেনকাটার বৈকুণ্ঠ, বাউর কাফনের প্যারী মোহন পান ও জাহিদপুরের নবকিশোর দে।
এরপর রেঙ্গা শরিষপুরের আস্কর আলী ছাবালপীরের প্রচেষ্টায় ১৯০২ খৃষ্টাব্দে, মঈনপুর বড়খালের পশ্চিম ধারে,আমার পিতার ধান মাড়াইয়ের খলিয়,গবর্ণমেন্টের অর্থানুকূল্যে,করগেট টিনের ঘরের মধ্যে প্রথম অনুমোদিত স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়।তখন শিক্ষক ছিলেন ছৈলার সোনাওর চৌধুরী জফরাবাদের আব্দুছ ছত্তার ও ভিদেশ্বরের মৌলবী সিকন্দর আলী।
২য় বিশ্বযুদ্ধ :
১৯১৪ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধ সচোক্ষে দেখেছেন মাস্টার আরজদ আলী। স্বরাজ আন্দোলনের সঙ্গে খেলাফত আন্দোলত তখন একাকার।বৃটিশ তখন সহযোগিতার জন্য অনুরোধ করে এবং যুদ্ধে জয়লাভ করলে স্বরাজ দান করবে বলে আশ্বাস দেয়।
তিনি বলেন,”ভারতের সকল জাতি,এই ঘোষণায় আস্হা স্হাপন করে,সর্ব্বস্ব নিয়ে যুদ্ধে যোগদান করে।অগ্নি কবি কাজি নজরুল ইসলাম,পল্টন সাহিত্যিক মহবুবুল আলম পর্য্যস্ত বছরার যুদ্ধ ক্ষেত্রে নেমে পড়েন।
বৃটিশদের মিথ্যা আশ্বাস:
ভারতের মুসলমানরা ২য় বিশ্ব যুদ্ধকালে বৃটিশের গরল কথা সহজভাবে বিশ্বাস করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে,কিন্তু বৃটিশ তার কথা রাখে নি।এ বিষয়ে মাস্টার আরজদ আলী বলেন,”যুদ্ধ জয়ের সঙ্গে সঙ্গেই,মিত্রপক্ষ তুরস্কের খলিফার সাম্রাজ্য ভাগাভাগি করে নেয়।সিরিয়া নিল ফরাসীরা,আর মেসোপটেমিয়া ইরাক নিল ইংরেজরা।
এ হঠকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ভারতের পুরো মুসলিমজাতি ক্ষেপে যায়।প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে।
মঈনপুরে খেলাফত আন্দোলন:
আলেম সাহেব ইংরাজদের সঙ্গে”তরকে মওরালাৎ “ঘোষণা করে।বিলাতী শিল্প পণ্য দ্রব্যাদি বর্জন করে ইংরাজদের ব্যবসা বাণিজ্য স্তব্ধ করতে চাইলেন।এই হট্টগোলের সময় মঈনপুর বাজারে খেলাফত কমিটির একটি অধিবেশন হয়।সকাল থেকে লোক দলে দলে সভা মন্ডপে প্রবেশ করতে থাকেন।গান্ধী টুপী পরিহিত স্বেচ্ছাসেবীরা।
আমরা, ছোট ছোট ছেলারা,তাদের সঙ্গে আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিয়ে,”কোটি কোটি মুসলমান,হাতে লওরে জয় নিশান,দ্বীনের কাজে হওরে আগুয়ান”গেয়ে গেয়ে তাদের পিছনে দৌড়াতে লাগলাম।বুরাইয়ার মৌলানা খুরশেদ আলী সাহেব,টাইটেল কোর্স পাস করে,সর্বপ্রথম এই সভায় যোগদান করেন।
(আমার)স্কুলে ভর্তি:
মাস্টার আরজদ আলী স তাঁর চাচা সঙ্গে গিয়ে ১৯২১ সালে স্কুলে ভর্তি হন।স্কুল কোনমতে চলছিল।
আমরা তাঁর মুখ থেকে শোনব স্কুলের কথা,খাড়ামুড়ার আহমদ আলী পীর সাহেব একমাত্র শিক্ষক, চতুর্থ শ্রেণী পাস;জমিকালি,পুকুরকালি,গাছ কালি সব রকম আঙ্কে অস্তাদ।
স্কুল ও শিক্ষক বদলের কারণে তখনকার লেখাপড়ার বেহালদশা ছিল।তিনি বলেন,” আরম্ভ হল স্কুল গৃহের স্হান পরিবর্তন ও শিক্ষক পরিবর্তনের পালা,আর বিদ্যা শিক্ষার চরম ও পরম মর্ম উপলদ্ধি;শিক্ষার আদান প্রদানের সেকেলে পদ্ধতিতে অনভিজ্ঞ অনুপযুক্ত শিক্ষকদের হাতে অপোগণ্ড ছেলেদের নিষ্ঠুর শাস্তি ভোগ।
শিক্ষক বদলের কারণ:
তিনি স্কুলে গবর্ণমেন্টের কোনো সাহায্য ছিল না।কাজেই নিজের খেয়ে বনের মোষ কে কত দিন তাড়ায়?মাষ্টার মশায়দেও সকলের মুখাবয়বেরর স্মৃতি,আজ আর মানসপটে স্পষ্ট ভেসে উঠেনা।
শিক্ষকবৃন্দ :
পালপুরের গোলন্দ্র ঠাকুর,ময্যাদের দীনবন্ধু রায়,খালিশার রমণ পাল,পাটলীর দেলওয়ার হসেন,দাউদপুর কুনার পাড়ার আব্দুস শহীদ চৌধুরী,দেবেন্দ্র দেব,তেরা মিয়া,মছদ্দর আলী,সিকন্দর আলী ও গয়হর।
শিক্ষকরা বদলি হলে কি হবে ছাবালপীর কিন্তু হাল ছাড়তে নারাজ।তিনি স্কুলের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি দিচ্ছেন।
১৯২৩ সালে তিনি দু’জন দক্ষ শিক্ষক নিয়ে আসেন,তাঁরা হলেন-ওসমান পুরের সৈয়দ এরশাদ আলী (এম, ই)ও সিঙ্গেরকাছের সবুজ মিয়া(এম ই)।
শিক্ষকদের নিপুণ দক্ষতায় স্কুলটি কেন্দ্রে রুপান্তির হয় এবং ১৯২৫ সালে লোকাল বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।এ বছর একজন ছাত্র বৃত্তিও পায়।চলবে…
লেখক
এস জামান
স্কুলশিক্ষক